জুলাই সনদ কী, কেন সেটি নিয়ে এত আলোচনা
বাংলাদেশে সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত কয়েকমাস ধরে দফায় দফায় আলোচনার পরও মৌলিক অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দূর করা যায়নি। এমনকি যে সব বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেগুলো বাস্তবায়নে গণভোট না কি সংসদ নির্বাচন-সেই বিতর্কও এখন সামনে এসেছে।
প্রতীকী ছবি
ঐকমত্য কমিশন শিগগিরই দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ ঘোষণার আশা করছে।
তবে জুলাই সনদ আসলে কী, কেন এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ, অন্যদিকে জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের মধ্যে পার্থক্য কী-এসব প্রশ্ন এখন আলোচনায় আসছে।
কমিশন দাবি করছে, কয়েক দফার আলোচনায় এরই মধ্যে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
তবে, এখনো আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল বা এনসিসি গঠনসহ বেশ কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে দলগুলোর মধ্যে নানা মতবিরোধও দেখা দিচ্ছে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মত ভিন্নতা থাকলেও এই মাসের শেষ নাগাদ দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তারা জুলাই সনদ চুড়ান্ত করবে।
তবে, এখনো বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় সময়মতো জুলাই সনদ তৈরি নিয়ে শঙ্কা দেখা যাচ্ছে।
কমিশন ঘোষিত সময়ের মধ্যে জুলাই সনদ না হলে আগামী তেসরা অগাস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে জুলাইয়ের ইশতেহার ও ঘোষণাপত্র প্রকাশের কথাও বলছে এনসিপি।
এমন প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশন বলছে, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ দুটি একেবারেই আলাদা বিষয়। কেননা সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সনদ বা সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি হবে, সেটি জুলাই সনদ বা জাতীয় সনদ।
তার বলছে, জুলাইয়ের ঘোঘণাপত্র তৈরির কাজ ঐকমত্য কমিশনের নয়, সেটি সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে করবে। শুধুমাত্র জুলাই সনদ প্রস্তুত করবে ঐকমত্য কমিশন।
গত বছরের পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৩১শে ডিসেম্বর জুলাই প্রোক্লেমেশন বা গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে চেয়েছিল।
পরে অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আশ্বাসে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে শিক্ষার্থীরা। পরে সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
জুলাই সনদ কী?
গত ছয়ই জুন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস বলেছেন, 'জুলাই সনদ হলো একটি প্রতিশ্রুতি। একটা জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংস্কার কমিশন যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, সেগুলোর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলগুলো যে কটিতে একমত হয়েছে, তার তালিকা থাকবে এই সনদে'।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারে যে ১১টি কমিশন গঠন করে, সে সব কমিশনের প্রস্তাবগুলো নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ধারাবাহিক সংলাপ করছে ঐকমত্য কমিশন।
এতে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার সংক্রান্ত মোট ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক বৈঠক করে ঐকমত্য কমিশন।
ঐকমত্য কমিশনের সাথে ধারাবাহিক এই আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।
ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, এসব প্রস্তাবনার মধ্যে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাবনায় সামগ্রিকভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে রাজনৈতিক দলগুলো। পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ আরো ২০টির মত প্রস্তাবনা চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ওই ২০টির মধ্যে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বাকি প্রায় ছয় থেকে সাতটি বিষয় আমরা আলোচনা করেছি যেগুলো এখন পর্যন্ত আমরা কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি"।
কমিশন বলছে, গুরুত্বপূর্ণ এইসব প্রস্তাবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজী করানোর পর এগুলো নিয়েই তৈরি হবে জুলাই সনদ।
ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের এখন কতগুলো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য দরকার। তা না হলে আবারো স্বৈরাচারের পুনরুত্থান আমরা ঠেকাতে পারবো না"।
অবশ্য ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্ত সংস্কার প্রস্তাবকে আপাতত জুলাই সনদ বললেও শেষ পর্যন্ত এটির নাম পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছে।
অধ্যাপক রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা আসলে জাতীয় সনদ। আবার জুলাই সনদ এই অর্থে, যাতে জুলাই সনদ বললে আগামীতে বোঝা যাবে ২০২৪ জুলাইয়ে কি ঘটেছিল, যার প্রেক্ষিতে এই সনদ করতে হয়েছে"।
"জাতীয় কিংবা জুলাই সনদ যে নামই থাকুক না কেন এই সনদ আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে মাইলফলক হিসেবেই থাকবে", বলছিলেন অধ্যাপক রীয়াজ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য এই সনদকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দালিলিক ভিত্তি হিসেবেই দেখছেন।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জুলাই আমাদের যে বার্তা দিল, সেটার একটা দলিল থাকা দরকার। সে জন্য জুলাই সনদ থাকা জরুরি"।
জুলাই সনদ নিয়ে কে কী চায়
বহুল আলোচিত জুলাই সনদ নিয়ে নানামুখী সমীকরণ
হচ্ছে রাজনীতিতে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা সনদের বিষয়বস্তু
দেখেই তাতে সই করবেন। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো বলছে—ওই সনদের আলোকেই
হতে হবে আগামী নির্বাচন। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানকারী শিক্ষার্থীদের দল এনসিপি
বলছে, নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখার মতো জুলাই সনদের পরিণতি দেখতে চায় না
তারা। অর্থাৎ জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে এখন পর্যন্ত একমত হতে পারেনি রাজনৈতিক
সংগঠনগুলো। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামী দল
মোটামুটি একই সুরে কথা বললেও তাদের সঙ্গে দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির
মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষিত সময় অর্থাৎ জুলাইয়ের মধ্যে
‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা করা সম্ভব হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে এরই মধ্যে
জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র নিয়ে সরকারের ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে। জুলাই সনদ ও
ঘোষণাপত্র নিয়ে দলগুলোকে এক কাতারে আনতে আজ মঙ্গলবার থেকে তিন দিনব্যাপী
ফের বৈঠকে বসছে ঐকমত্য কমিশন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জুলাই-আগস্টের
অভ্যুত্থান মনে রাখতে এই সনদের বিকল্প নেই।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক কালবেলাকে বলেন, আগামী দিনের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জুলাই সনদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় কোন কোন বিষয় পরিবর্তন আনা হবে, সেটাই উল্লেখ থাকবে জুলাই সনদে, আর সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
সরকার পক্ষ কী বলছে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের সূত্রের ভাষ্য, জুলাই সনদ ঘোষণার পথে ‘বাধা’ বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। জুলাই-আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র চায় না তারা। তাদের মতে, নির্বাচনের পর দেশের জন্য যা কিছু ভালো তা নির্ধারণ করবে নির্বাচিত সরকার। ফলে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলোকে রাজি করাতে সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা তিন দিন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এসব বৈঠকে সংস্কার নিয়েও আলোচনা হবে। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
গত মে মাসে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও জুলাই সনদ এবং জুলাই ঘোষণাপত্র চেয়ে যমুনা ঘেরাও করে তীব্র আন্দোলন করেছিল এনসিপি, জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো। সে আন্দোলনে যোগ দেয়নি বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। আন্দোলনের চাপে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার আওয়ামী লীগের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ ছাড়া ২৫ জুনের মধ্যে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে—এমন আশ্বাস দিয়ে আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরাতে সক্ষম হয়। কিন্তু ঘোষিত সময়ের বাকি আর মাত্র ৮ দিন। এরই মধ্যে গত ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামী জুলাই মাসে ‘জুলাই সনদ’ ঘোষিত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনো ঐকমত্যে নিয়ে আসতে পারেনি সরকার। তবে যে করেই হোক সবাইকে এক কাতারে এনে জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতেই হবে বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা। বিএনপি যা বলছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল কালবেলাকে বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রের দায়িত্ব সরকার নিয়েছে। আমরা কো-অপারেট (সহযোগিতা) করেছি। ছাত্ররা তাদের বয়ান দিয়েছে। আলোচনা করে আমরা আমাদের ড্রাফট বক্তব্য গত ১২ ফেব্রুয়ারি দিয়েছি। বল এখন সরকারের কোর্টে। এটা সমন্বয় করার দায়িত্ব সরকারের। কী হয় দেখা যাক। আমরা যদি মনে করি, সেটা (জুলাই ঘোষণাপত্র) যথোপযুক্ত হয়নি, তাহলে আমরা ওইটার সঙ্গে কতটুকু সংশ্লিষ্ট থাকব, সেটা তখন দেখা যাবে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এটি (জুলাই ঘোষণাপত্র) শুধু একটি রাজনৈতিক দলিল। এর সাংবিধানিক ভিত্তি ও গুরুত্ব নেই। জুলাই সনদ ও সংস্কার নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির প্রভাবশালী এই নেতা।
নির্বাচনের আগেই সনদ চায় জামায়াত তবে সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের কালবেলাকে বলেন, অবশ্যই নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ হওয়া উচিত। তবে সেখানে কী কী জিনিস অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়। তিনি বলেন, কী জিনিসের ওপর জুলাই সনদ তৈরি হবে, সেটা যখন প্রণয়নের সময় আসবে তখন আমরা কথা বলব। ডা. তাহের বলেন, জুলাই সনদে অবশ্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সরকারের মৌলিক চরিত্র কী হবে, নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে, যারা জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও পঙ্গু হয়েছেন তাদের জাতি কী হিসেবে দেখবে, জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার বিচারের বিষয়ে কী হবে—এসব বিষয়কে রেখেই জুলাই সনদ হতে হবে। আগামী জুলাইতেই জুলাই সনদ হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক সাংসদ ডা. আব্দুল্লাহ তাহের।
অন্য দলগুলো যা বলছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমরা তো শুরু থেকেই জুলাই সনদের বিষয়ে বলে আসছি। কারণ জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে একটা প্রত্যাশা ছিল। রাষ্ট্র সংস্কার ছিল মূল একটি বিষয়। জুলাই সনদ এজন্য হওয়া দরকার যে, সামনে যারাই ক্ষমতায় আসুক যাতে বিগত দিনের মতো একদলীয় শাসন কায়েম না করে। বিগত দিনের মতো স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন না করে। সঠিকভাবে যাতে দেশ চলে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও যাতে গঠনমূলক রাজনীতি করে এবং যেভাবে দেশটি চললে জাতীয় ঐক্য হওয়া দরকার, সেটি সহজ হয়। বিশেষ করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয় সুরক্ষিত থাকে এবং কিছু মৌলিক বিষয়ে যাতে সব রাজনৈতিক দল একমত থাকে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয়, প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি আরও বলেন, আসলে জুলাই অভ্যুত্থান যেসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছে সেসব ঘটনা যাতে সামনে আর না ঘটে দেশে—এ বিষয়টি জুলাই সনদে উল্লেখ থাকতে হবে। যাতে সব রাজনৈতিক দল আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। আসলে পুরোনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আমাদের নতুন একটা বন্দোবস্ত দরকার।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু গতকাল কালবেলাকে বলেন, জুলাই সনদ হওয়া শুধু উচিত নয়, এটা একান্ত আবশ্যক। এই সনদটা হলো জুলাই অভ্যুত্থানের একটা অঙ্গীকার। যা না করাটা হবে বিশাল আত্মত্যাগের সঙ্গে প্রতারণা। সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপি যদি সহযোগিতা করে, তাহলে এই সনদ তৈরি সহজ হবে বলে আমি মনে করি। জুলাই সনদে আমরা যেসব মৌলিক সংস্কারের ব্যাপারে একমত হয়েছি, তার সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা দরকার। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি পরমত সহিষ্ণুতা মেনে চলার অঙ্গীকার থাকা দরকার।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া কালবেলাকে বলেন, জুলাই সনদ তৈরি হবে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। বিচার, সংস্কার দায়মুক্তিই মূল ভিত্তি হবে। আর সরকারকে এটা করতেই হবে। জুলাই সনদ করতে না পারার কোনো কারণ দেখি না। অভ্যুত্থানকে আমলে নিয়ে এটা তৈরি করতেই হবে। সামনে এগিয়ে যেতে হলে ‘জুলাই সনদ’ হওয়া উচিত। অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দ্বারা যা ঘটেছে, তাকে দায়মুক্তি দিতেই হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয়েছে, তাদের দ্বারা নির্যাতিত ও নৃশংসতার শিকার হয়েছে। সে কারণে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। অভ্যুত্থানের পর যে মব ভায়োলেন্স হয়েছে, সেগুলোর বিচারও হতে হবে। সে বিষয়ে দায়মুক্তির সুযোগ নেই।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব কালবেলাকে বলেন, জুলাই মাসের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র অবশ্যই দিতে হবে। অন্যথায় সেটি জনগণ মেনে নেবে না। জুলাইয়ের কোনো আইনি স্বীকৃতি এবং মৌলিক সংস্কার ছাড়া আমরা নির্বাচনের পক্ষে নয়।
দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ কালবেলাকে বলেন, জুলাই সনদের আগে একটা রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবি করছি আমরা। এটি ছাড়া জুলাই সনদের গ্রাউন্ড নেই। তাই আমরা বলছি, আগে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে হবে। ঘোষণাপত্রে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে যে প্রেক্ষাপটে, সে প্রেক্ষাপট তুলে ধরব এবং সে প্রেক্ষাপটগুলোর ভিত্তিতেই জুলাই ঘোষণাপত্র হবে। এর রেফারেন্স পয়েন্ট জুলাই সনদের গ্রাউন্ড হিসেবে কাজ করবে। জুলাই সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার থেকে শুরু করে সব জায়গায় আমরা ঐকমত্য কমিশনকে যেসব প্রস্তাব দিয়ে এসেছি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান, রাষ্ট্রপতির কার্যকর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, সংসদে নারীর সরাসরি প্রতিনিধিত্ব, ৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকর সংস্কারসহ এ বিষয়গুলো থাকবে। এ ছাড়া আমরা চাই যে মোটাদাগে মৌলিক সংস্কারের যে এজেন্ডা, সে এজেন্ডাগুলোতে সবাই একমত হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান যাতে গণতান্ত্রিকভাবে কাজ করতে পারে এবং আর কখনোই যেন স্বৈরাচারের জন্ম না দেয়, তার ওপর ভিত্তি করেই জুলাই সনদটা হতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে জুলাই সনদের কোনো বিষয়কে ভায়োলেন্ট করে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, সেটাও স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে এবং জুলাই সনদকে অবশ্যই একটি আইনি ভিত্তি প্রধান করতে হবে।
ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন জুলাই সনদ ঘোষণা ও বাস্তবায়ন এবং জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই জুলাইয়ে গণহত্যার বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে জুলাই জুলাই সনদ নিয়ে ১৩টি প্রস্তাবনা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলন করে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই সনদ ঘোষণার জন্য যে ৩০ দিন সময় নিয়েছিল, তা শেষ হবে আগামী ২৫ জুন। জুলাই সনদ ঘোষণার জন্য আর ৯ দিন বাকি থাকলেও উপদেষ্টা পরিষদের জুলাই সনদ নিয়ে ফরমালি (আনুষ্ঠানিক) একটা মিটিংও হয়নি বলে আমরা জানতে পেরেছি। গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাইয়ে গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার না করে যদি নির্বাচন করা হয়, আমরা ড. ইউনূসকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গাদ্দার ঘোষণা করব। জুলাই সনদের বিষয়বস্তুতে সংগঠনটি ১৩টি প্রস্তাবনা দিয়েছে। তাদের প্রথম প্রস্তাবনাটি হলো—১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং এই সংগ্রামে জীবন দেওয়া সব শহীদদের রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
রাজনৈতিক ঐকমত্য নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় যে পাঁচটি প্রস্তাবে সব দল একমত হয়েছে, সেগুলো হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান সংশোধন করা এবং হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, এই আলোচনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ ছয় থেকে সাতটি বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় এখন পর্যন্ত আমরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। তবুও সেগুলোতে ঐকমত্যে পৌছাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি"।
দ্বিতীয় দফার ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী পদে ভিন্ন ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে প্রস্তাবনা ছিল ঐকমত্য কমিশনের।
এছাড়াও জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ বা এনসিসি গঠন করে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগের বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে।
কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি বলে জানিয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার।
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার দ্বিতীয় দিনের আলোচনা শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, 'সব বিষয়েই যদি ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে শতভাগ একমত হতে হয়, তবে আলোচনার কি প্রয়োজন ছিল?'
তবে এই প্রশ্নে অধ্যাপক রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তার মানে এই নয় যে এ নিয়ে আমরা কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি বা এগুলো বাতিল হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে পরে আরো আলোচনা হবে। আমরা যথেষ্ট রকম আশাবাদী"।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করছেন, সব ইস্যুতে সবাই একমত হবে বিষয়টি এমন নয়।
"আমরা দেখেছি সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে ঐকমত্য হচ্ছে না। কারণ সবাই নিজেদের 'বুলি' এই সনদে দেখতে চায়। এটা করতে গেলে ঐকমত্য হবে না", বলছিলেন বিশ্লেষক মি. আহমদ।
রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে জুলাই সনদ চূড়ান্ত হবে, সেটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে- এই প্রশ্নও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সামনে আসছে।
কেননা এ নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর।
সংস্কার প্রস্তাবগুলো যখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটি বাস্তবায়নের জন্য ছয়টি আলাদা বিকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে।
এক্ষেত্রে - নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে, নির্বাচনের সময় গণভোটের মাধ্যমে, গণপরিষদের মাধ্যমে, নির্বাচনের পরে সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে এবং 'গণপরিষদ ও আইনসভা হিসেবে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে।
ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের একমাত্র পথ হিসেবে জাতীয় সংসদের কথা বলেছে বিএনপি, সিপিবি-বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
অন্যদিকে, গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছে এনসিপির অবস্থান।
তবে, জামায়াত ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল রাজনৈতিক ঐকমত্য পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। তাদের অবস্থান হলো, যদি শেষ পর্যন্ত সবার মতামতের ভিত্তিতে জুলাই সনদ চূড়ান্ত হয়, সব দলগুলো যদি তাতে স্বাক্ষর করে তাহলে আগামী নির্বাচিত সংসদে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই দ্বিধা-বিভক্ত অবস্থান জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে বাধা হবে কী-না সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
তবে এই প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন খুব বেশি চিন্তিত নয় বলে জানিয়েছেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
অধ্যাপক রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিষয়ের দিক থেকে কি পরিবর্তন করা দরকার, সেটা আমরা চূড়ান্ত করে দিতে পারি। কিন্তু কিভাবে বাস্তবায়ন হবে সেই বিষয়টি আমরা নির্ধারণ করে দিতে পারি না। সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে সিদ্ধান্ত নিতে পারে"।
"'হোয়াট' অ্যান্ড 'হাউ' এর মধ্যে আমরা হোয়াট'কে লক্ষ করে কাজ করছি। যদি ঐকমত্যে এনে একটা সনদ আমরা করতে পারি, তখন রাজনৈতিক দলগুলো পারষ্পারিক আলোচনার ভিত্তিতে তা বাস্তবায়নের একটা পথ নিশ্চয়ই তৈরি করতে পারবে", যোগ করেন তিনি।




